ঠাকুরগাঁওয়ে টিউমারের কথা বলে রোগির অপারেশন, সিজারে বেরিয়ে এলো ২-৩ মাসের বাচ্চা !

লেখক: নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ৬ মাস আগে

ঠাকুরগাঁওয়ের সুশ্রী নার্সিং হোম নামের একটি প্রাইভেট ক্লিনিকে টিউমারের কথা বলে রোগির অপারেশন করা হয়েছে, পরে সিজার করার পর দেখা যায় টিউমার বলে যেটি সন্দেহ করা হচ্ছিলো সেটি ছিলো ওই রোগির ২-৩ মাসের বাচ্চা ! এটি একটি জলজ্যান্ত হত্যা হলেও এটার দায়ভার নিতে রাজি নন অপারেশনকারি ডাক্তার মো: জাহাঙ্গীর আলম ও আলট্রাসনোগ্রাম রিপোর্ট প্রদানকারি ডা: মো: মিরাজুল ইসলাম। প্রশ্ন-তবে এর দায় কার…?

ভুক্তভোগি রোগির নাম আলেয়া (২৬), তিনি দুই সন্তানের জননী এবং সদর উপজেলার আকচা ইউনিয়নের দক্ষিণ বটিনা ইসলামপুর ঘাটপাড়া এলাকার মো: ফারুক হোসেন এর স্ত্রী।বর্তমানে তিনি সুশ্রী নার্সিং হোমে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

আমাদের অনুসন্ধানী রিপোর্টার একান্তে কথা বলেছেন কনসালটেন্ট সনোলজিস্ট ডা: মিরাজুল ইসলাম সোনা’র সাথে। তিনি প্রথমে জানান, টেস্টের সময় তিনি ছিলেন না।তবে রিপোর্টের স্বাক্ষর তার কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, হ্যাঁ মনে পড়েছে এটা আমারই স্বাক্ষর।তার ভাষ্য, সেটা ছিলো ইকটুপিক( Ectopic) যার অর্থ যেকানে বাচ্চা থাকার কথা সেখানে বাচ্চা ছিলো না।আরেকটু ভেঙ্গে বললে দাড়ায় নরমালভাবে বাচ্চা জরায়ুতে থাকার কথা, কিন্তু বাচ্চা ছিলো তলপেটের বাম দিকে।তাই তিনি সেভাবে রিপোর্ট দিয়েছেন। কিন্তু তার দেয়া আলট্রাসনোগ্রাম রিপোর্টে স্পস্ট লিখা রয়েছে ‘কমপ্লেক্স লেফ্ট এডনেক্সাল মাস’ যার বাংলা অর্থ -জটিল বাম অ্যাডনেক্সাল ভর। এদিকে মহিলা প্রেগনেন্ট হলে তার তো ঋতৃস্রাব বন্ধ থাকার কথা, এসব বিষয়ে জানা ছিলো কি না-এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, এটা জিজ্ঞাসা করার দায়িত্ব যে চিকিৎসকরে কাছে তারা চেকআপ করিয়েছেন তার।হয়তো তিনি এ বিষয়ে অবগত হননি, বা রোগি নিজ থেকে বলেনি-এজন্য এমনটা ঘটে থাকতে পারে।

এদিকে সুশ্রী নার্সিং হোমের মানেজারের দায়িত্বে থাকা রোহিত কুমার রায় জানান, দেশ এক্সরে ক্লিনিক হতে ডা: সোনা যে রিপোর্ট দিয়েছেন তার মানে দাড়ায় টিউমার জাতীয় কিছু। সে মোতাবেক রোগির অপারেশনকারি ডা: মো: জাহাঙ্গীর আলম সিজার করেন। সিজারের পর দেখা যায় সেটি টিউমার নয়, আসলে সেটি ছিলো ২-৩ মাসের বাচ্চা। এতে রোগির রক্ত স্বল্পতা হয়ে রক্তের প্রয়োজন হয়।পরে বাহির থেকে এক ব্যাগ ও রোগির বোন এক ব্যাগসহ মোট দুই ব্যাগ রক্ত পুশ করা হয় রোগির শরীরে। বর্তমানে রোগি মোটামুটি সুস্থ রয়েছে।

এ বিষয়ে রোগির স্বামী ফারুক হোসেন জানান, তার স্ত্রী কয়েক দিন থেকে পেটের ব্যাথায় কাতরাচ্ছিলো, তাই শহরে ডাক্তার দেখান।ডাক্তারের পরামর্শে আলট্রাসনোগ্রাম করে ডাক্তার জানান রোগির পেটে টিউমার রয়েছে, সেটি অপারেশন করতে হবে, না হলে রোগির সমস্যা সমাধান হবে না। নিরুপায় হয়ে তিনি বাসায় গিয়ে টাকা-পয়সা জোগাড় করে ২০ আগষ্ট সুশ্রী নার্সিং হোমে স্ত্রী আলেয়াকে ভর্তি করেন এবং সেদিন বিকেলেই রোগির সিজার করেন ডা: জাহাঙ্গীর আলম। সিজারের পর ডাক্তার তাকে জানান, তাদের ধারণা ছিলো এটি টিউমার কিন্তু আসলে সেটি টিউমার ছিলো না, সেটি ছিলো ২-৩ মাসের বাচ্চা।পরে ডাক্তার তাকে শান্তনা দিয়ে বলেন, আল্লাহ্ চাইলে আপনার আরও সন্তান হবে-এটা নিয়ে মন খারাপ করবেন না।

আলেয়ার মা মোছা. ছালেহা জানান, আমরা গরীব মানুষ, খুব কষ্ট করে সংসার চালাই।এরমধ্যে এসব বাড়তি খরচ হওয়ায় আমরা খুব বিপদে পড়ে গেলাম। আমাদের সন্তানও হারালাম আবার ক্লিনিকের মোটা অঙ্কের খরচও প্রদান করতে হবে।আমাদের মতো কেউ যাতে এমন প্রতারণার শিকার না হয়। এসময় ডাক্তারদের আরও সতর্ক হওয়ার অনুরোধ জানান তিনি।

টিউমারের কথা বলে সিজার করে বাচ্চা বের হওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে অপারেশনকারি চিকিৎসক ডা. মো: জাহাঙ্গীর আলম জানান, এটি একটি দূর্ঘটনা। আমি আলট্রাসনোগ্রাম রিপোর্টের উপর ভিত্তি করে সিজার করেছি। পরে দেখা যায় সেটি বাচ্চা।তবে সব সময় এ ধরণের ঘটনা ঘটে না।পরবর্তীতে তিনি আরও বেশি সচেতন হবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

তবে ডা: মো: জাহাঙ্গীরের অতীত ইতিহাস ততোটা ভালো নয় বলে জানিয়েছেন স্থানীয় কয়েক বাসিন্দা। তারা জানান, এর আগেও এই ডাক্তারের বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ উঠেছে এবং প্রতিবারই তিনি কোন না কোনো ভাবে নিজেকে সেভ করে নেন।তবে এর একটা বিহিত হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন তারা।

বিডি/ডেস্ক