সরকার আখের মূল্য বাড়ায় ঠাকুরগাঁওয়ে আখচাষে ফিরছে চাষীরা

লেখক: নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২ মাস আগে

ঠাকুরগাঁও চিনিকলে প্রতি মাড়াই মৌসুমে ধারণ ক্ষমতা দেড় লাখ টন আখ এবং উৎপাদন ক্ষমতা ১০ হাজার মে টন চিনি। গত চার বছরে আখ মাড়াই ও চিনি উৎপাদন কখনো বেড়েছে কখনো কমেছে। কিন্তু মাড়াই ও উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়নি চিনিকলের। ফলে প্রতিবছর লোকসান গুণেছে প্রতিষ্ঠানটি। চিনিকলে ২০২২-২৩ মাড়াই মৌসুম শুরু হবে ডিসেম্বরে। এ মাড়াই মৌসুম থেকে চিনিকলটি সম্ভাবনার নতুন বার্তা দিচ্ছে বলে দাবি করছেন চিনিকল কর্তৃপক্ষ।

ঠাকুরগাঁও চিনিকলের মহাব্যবস্থাপক(কৃষি) আবু রায়হান জানান, গত ২০২০-২১ মাড়াই মৌসুমে বাংলাদেশের ১৫ টি চিনিকলের মধ্যে ৬ টি চিনিকল বন্ধ ঘোষণা করে সরকার। সে সময় এই চিনিকলটি বন্ধের শঙ্কায় আখ চাষে মুখ ফিরিয়ে নেন কৃষকরা। তবে আমরা কৃষকদের আখ চাষে ফেরাতে সক্ষম হচ্ছি। গতবছরের চেয়ে এবার দ্বিগুণ আখ চাষ করেছেন আখ চাষীরা। এবছরেও আখ রোপনে ব্যস্ত সময় পার করছেন নতুন অনেক আখ চাষী। তাই আমরা বলতে পারি আখের উৎপাদন এভাবে বৃদ্ধি পেলে লাভের অংকে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে ঠাকুরগাঁও চিনিকলের।

ঠাকুরগাঁও চিনি কলের কৃষি বিভাগের দেয়া তথ্যমতে চিনিকলে ২০১৮-১৯ মাড়াই মৌসুমে জেলার চাষীদের ৬১ হাজার ৭৬০ মেঃটন আখ মাড়াই হয়েছিল। চিনিকল বন্ধ হবে এমন গুঞ্জনে পরের মাড়াই মৌসুম ২০১৯-২০ এ কমে এসে আখ মাড়াই হয়েছিল ৫৩ হাজার ৮৭৯ টন আখ। তারপরের বছর ২০২০-২১ মাড়াই মৌসুমে দেশের ৬ চিনিকল বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর ঠাকুগাঁও চিনিকলও বন্ধের শঙ্কায় আখ চাষে মুখ ফিরিয়ে নেন জেলার অধিকাংশ চাষী। ২০২০-২১ মাড়াই মৌসুমে পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও ও সেতাবগঞ্জ তিন মিলের আখ মাড়াই হয় ঠাকুরগাঁও চিনি কলে। এই মৌসুমে চিনিকলে আখ মাড়াই হয় ১ লাখ ১৩ টন আখ। এই মাড়াই মৌসুমে জেলার ৫০ হাজার টন আখ মাড়াই হয়েছিল চিনিকলে। গত বার ২০২১-২০২২ মাড়াই মৌসুমে পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁওয়ের ৫৭ হাজার ৮৩৪ টন আখ মাড়াই হয় চিনিকলে। গত বছর জেলার আখচাষীরা উৎপাদন করেছিল ৩৬ হাজার টন আখ।

তবে এ বছর মাড়াই মৌসুমে শুধুমাত্র ঠাকুরগাঁওয়ের আখ মাড়াই হবে চিনি কলে। এবারে জেলাতে আখের চাষ বেড়েছে বলে জানিয়ে ঠাকুরগাঁও চিনি কলের মহাব্যবস্থাপক (কৃষি) বলেন, নানা সমস্যার কারনে জেলার কৃষকরা আখ চাষে মুখ ফিরিয়ে নিলেও সরকারের নির্ধারিত দামে খুশী হয়ে আখ চাষে ফিরতে শুরু করেছেন তারা। গতবছর দুই জেলা মিলে যা উৎপাদন হয়েছিল এবার ঠাকুরগাঁওয়ে দ্বিগুণ আখ চাষ হয়েছে। তিনি বলেন গত বছর মাড়াই মৌসুমে জেলার ৩৬ হাজার টন আখ মাড়াই হয়েছিল। এবারে ৬০ হাজার টন আখ মাড়াইয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরেছি আমরা।

তিনি আরও জানান, চিনিকলের নিজস্ব জমি রয়েছে ৭২৭ হেক্টর।এছাড়াও বর্তমানে জেলার প্রায় ২ হাজার হেক্টর জমিতে আখ উৎপাদন করছে ৩ হাজার কৃষক। মোট ৪ হাজার হেক্টর জমিতে আখ চাষ হলেই সুদিন ফিরবে চিনিকলটির। আগামি বছর আখচাষী আরও বাড়বে এমন দাবি এই চিনিকল কর্মকর্তার। এই কর্মকর্তার দাবি আখচাষীদেরকে সরকারের দেয়া সুযোগ সুবিধা, আখের দাম প্রতি কুইন্টালে ১০০ টাকা বাড়িয়ে ৪৫০ টাকা বর্ধিত করণ সহ নানা বিষয়ে তাদের সাথে বৈঠক করে আখ চাষে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। বর্তমানে জেলাতে চলছে আখ রোপনের সময়।

মাঠে ঘুরে দেখা গেছে আখ রোপনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন সদর উপজেলার আকচা গ্রামের কৃষক হাসান আলী। তিনি জানালেন, এক বিঘা জমিতে আখ উৎপাদন করে আগে তেমন দাম পাওয়া যেতনা। আর এখন সরকার যে দাম দিয়েছেন আমি মনে করি আখই একমাত্র লাভজনক ফসল। প্রতি বিঘাতে বছরে ৫০-৬০ হাজার টাকা লাভবান হওয়া যায় আখচাষে।

চিলারং ইউনিয়নের কৃষক সলেমান আলী বলেন, এক বিঘা জমিতে আখ রোপনের সময় খরচ হয় ৮ হাজার টাকা। এছাড়াও চিনিকলে মাড়াইয়ের জন্য পাঠাতে খরচ হয় ৩০-৩৫ হাজার টাকা। যত্ন নিয়ে আখের ফলন ভালো হয়ে প্রায় লাখ টাকায় বিক্রি হয় আখ। আমি আখ উৎপাদন করে বর্তমানে আমার ও চিনিকলের সম্ভাবনা দেখছি।৷ চিনিকল কর্তৃপক্ষ যথাসাধ্য সহযোগিতা করছেন আমাদের।

২০২০ সালে ২৯ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রয়াত্ত চিনি শিল্প বাঁচাতে সাত দফা দাবি জানিয়ে আন্দোলনে নেমেছিল জেলাবাসী। আন্দোলনের দাবিগুলো ছিল ঠাকুরগাঁও চিনিকল লাভজনক করতে আধুনিকায়ন ও ডিস্টিলারি ইউনিট স্থাপন, বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপন, সুগার বিট প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন, শ্রমিকদের বকেয়া বেতন ও অবসরপ্রাপ্ত শ্রমিকদের গ্র্যাচুইটির টাকা পরিশোধ, আখচাষিদের টাকা সময়মতো পরিশোধসহ সারা বছর চিনিকল চালু রাখতে সেগুলোকে র সুগার আমদানির অনুমতি দিয়ে পরিশোধন কারখানা স্থাপন। আন্দোলনের আহ্বায়ক মাহাবুব আলম রুবেল বলেন, বর্তমানে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য চিনির দাম ঊর্ধ্বগতি। আখের উৎপাদন বাড়িয়ে এ চিনিকলগুলো বাঁচিয়ে রাখতে না পারলে আমাদের পুরোপুরিবাবে আমদানি নির্ভর হয়ে পড়তে হবে। জেলাতে আখের উৎপাদন বাড়াতে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা দরকার। আশা করি চিনিকলটির সুদিন ফিরবে।

ঠাকুরগাঁও চিনিকলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহজাহান কবির বলেন, আমরা কৃষকদের বোঝানোর চেষ্টা করছি আখ উৎপাদন করে তারা লাভবান হতে পারবেন। আমরা কৃষকদের সার কীটনাশকের যোগান দিয়ে সহযোগিতা করছি। কৃষকরা আখ চাষে ঝুঁকছেন। আমরা চিনিকলটির সুদিনের সম্ভাবনা দেখছি।

বিডি/এসআর